ঢাকা, রবিবার ০৩ মার্চ ২০২৪, ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন
” শুক্তির প্রেম”- মোহাম্মদ আইয়ুব
★মোহাম্মদ আইয়ুব ★

পারিবারিক শিক্ষা-১

আনুপ আজ ফুরফুরে মেজাজে আছে। মেট্রিক পরীক্ষার প্রথম দিন। পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে। পড়ন্ত বিকেলে ফরেস্ট রেস্ট হাউসের টিলার ঢালুতে বসে শুক্তির বিষয়ে কল্পনায় মশগুল। খোরশেদ এসে পাশে বসেছে। আনুপের সেদিকে খেয়াল নেই।

শুক্তি শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে – কালচে সাদা রঙের শক্ত খোলসাবৃত মলাস্কা পর্বের কোমল দেহ বিশিষ্ট অমেরুদণ্ডী জলজ প্রাণীর গর্ভে জাত রত্নবিশেষ বা মোতি।
অন্য কথায় ঝিনুকের দেহের অভ্যন্তরে টিস্যু- বিকারের ফলে গড়ে ওঠা ক্যালসিয়াম কার্বনেট সমৃদ্ধ হালকা গোলাপি প্রভৃতি বর্ণের অস্বচ্ছ মসৃণ গোলাকার রত্ন বা মুক্তা।
আনুপের কল্পনার রাজ্যে যে শুক্তি বিরাজ করছে সে মেরুদণ্ডী প্রাণী। তবে তাকে প্রাণী বলা ঠিক হবে না। পুস্তকে আছে- প্রাণ থাকলেই প্রাণী হয় কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না। আনুপের শুক্তি হচ্ছে এক চতুর্দশী মেয়ে। ময়ূরাক্ষী আর কোমল দেহের মেয়েটির একটি সুন্দর মন আনুপের কল্পনায় আবিষ্কৃত হয়েছে।

আনুপের বয়স ষোল বছর।পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষক বাবার কৃষিকর্মে সহায়তা করে।

খোরশেদ গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল – কোন জগতে আছ?
আনুপ ভেবাচেকা খেয়ে – ওহ তুই, কখন আসলি?
– আসছি তো বেশ কিছুক্ষণ হলো। কিন্তু তুই যেন মহাকাশে বিচরণ করছিস।
আনুপ বলল- আজ পরীক্ষার হলে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিবেশী মিষ্টি, মুন্নি ও আনোয়ারার সাথে আরো একটি মেয়ে আমার সিটের সামনে আসে।
আনোয়ারা জিজ্ঞেস করে এটি তোর সিট?
আমি হ্যাঁ বলা মাত্রই সাথে আসা ময়ূরাক্ষীর সেই মেয়েটি আমার সামনে এসে বলল-
আমি শুক্তি।
-আমি আনুপ।
কেমন আছেন?
-ভালো। তবে একটু উদবিগ্ন। প্রথম পাবলিক পরীক্ষা তো।
উদবিগ্ন হলে চলবে না। পরীক্ষা ভালো করতে হবে। এরপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ডান হাতের তিন আঙুল বাঁকা করে বাই – বাই বলে হল থেকে বের হয়ে গেল।
খুব কাছ থেকে চোখাচোখির সময় ময়ূরের পেখমের নীল – সবুজ রঙের চোখাকৃতির মহা-কারুণিকের দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময় তার লোচন যুগল কী যেন ইঙ্গিত করেছে।
খোরশেদ – আনোয়ারা বা মিষ্টিকে জিজ্ঞেস করনি সে কে?
আনুপ- সে সময় পেলাম কই।
খোরশেদ বলল এইসব চিন্তা এখন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, পরীক্ষা শেষে জানা যাবে।

আনুপ আনোয়ারাকে পাটিগণিত ও বীজগণিতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তা করত।আনোয়ারা নবম শ্রেণীতে পড়ে।আনুপ দুইবছর সিনিয়র হলেও শৈশব থেকেই একজন আরেকজনকে তুইতোকারি করে কথা বলে।
আনুপ ঠিক করল পরীক্ষা শেষে আনোয়ারার কাছে জেনে নিবে শুক্তি নামের অপরূপ সুন্দর মেয়েটি কে?

শুক্তি হচ্ছে শিক্ষক বাবার বুদ্ধিমান মেয়ে। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক হলেও অঢেল সম্পত্তির মালিক। জমিদার বংশের লোক। উত্তরাধিকার সূত্রে যে সম্পত্তি তিনি পেয়েছেন তা চৌদ্দপুরুষ বসে খাইলেও কোণা শেষ হবে না। শিক্ষকতা পেশাটি বেছে নিয়েছেন কেবল এলাকার ছেলে- মেয়েদের সুশিক্ষিত করার ব্রতে। শুক্তিকে খুবই আদর করেন। কিন্তু পড়ানোর সময় অন্য দশজনের মতোই একজন ছাত্রী।

আনুপের পরীক্ষা শেষ। একদিন আনোয়ারার বাসায় গেল। উদ্দেশ্য শুক্তি প্রসঙ্গে জানা। জিজ্ঞেস করার আগেই আনোয়ারা বলল-
তোর পরীক্ষার হলে আমাদের সাথে গিয়েছিল, “শুক্তি মেয়েটি দেখতে কেমন ?”
– ভালই তো। সুন্দর, স্মার্ট তবে অদ্ভুত! মেয়েটি কে বলতো?

আনোয়ারা বলল- আমার ক্লাসমেট। শেখ নাজিম উদ্দিন স্যারের মেয়ে। সে তোকে খুব পছন্দ করে।
– চিনে না, জানে না, এতবড় জমিদার বংশের সুন্দরি বালিকা, আমাকে পছন্দ করার হেতু কী? ইয়ার্কি করার আর জায়গা পাওনা।
ইয়ার্কি না, সত্যি বলছি। তাহলে শোন – ৫/৬ মাস পূর্বে ক্লাসে নুর হোসেন স্যার আমার খাতায় তোমার করা অঙ্ক দেখে জানতে চাইলেন, এই অঙ্ক কে করছে? আমি তোর কথা বলি। কী করে জিজ্ঞেস করলে বলি – এবার মেট্রিক পরীক্ষার্থী। তখন স্যার তোর প্রশংসা করে বলছিলেন, ছেলেটি খুব মেধাবী হবে।
এর পর থেকে শুক্তি তোর ব্যাপারে জানতে চাইতো। মিষ্টি আর মুন্নি তোর সম্পর্কে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলায় সে তোকে নিয়ে খুবই কৌতূহলী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সে তোকে দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলে, পরীক্ষার হলে দেখা করার ব্যবস্থা করি। আমরা চার জন হলে যাব, যার সাথে আমি কথা বলব সেই আনুপ। পরিকল্পনা মোতাবেক সেদিন পরীক্ষার হলে যাওয়া।
আনুপ বলল – তো- তোর বান্ধবী কেমন দেখল আমাকে?
– সেটি স্কুল খুললে জানা যাবে। মেট্রিক পরীক্ষার লম্বা ছুটির পর আগামী কাল স্কুল খুলবে।
আনুপ বলল, তোর বান্ধবী আমাকে না দেখে পছন্দ করেছে বললে, দেখার পর সেই পছন্দতত্ত্ব কোন মেরুতে গিয়ে ঠেকল খবর নিয়ে দেখ।
পরের দিন মিষ্টি আর আনোয়ারা স্কুল থেকে এসে খুব আগ্রহ নিয়েই জানাল, আনুপকে তাদের বান্ধবীর ভাল লেগেছে।
আনুপের বিশ্বাস হয় না-
নিশ্চয় তারা আমাকে পরীক্ষা করছে। কিন্তু সেদিন মেয়েটির চোখ দুটি ছিল কথাপূর্ণ!

আমাকেও পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একটা চিঠি লিখে পাঠালে কেমন হয়।একে তো ধনীর ঘরের ধনি আবার কথা বলার স্টাইলে আলাদা আভিজাত্য প্রকাশ পায়। অন্যদিকে আমার গায়ের রং পাতিলকালো, হাবা- গোবা চেহারা। ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আমার চিঠি যদি তার বাবা – মা কিংবা স্কুলের শিক্ষকের হাতে দেয় তবে সর্বনাশ।

খোরশেদ আর খালেকের সাথে পরামর্শ করে আনুপ আনোয়ারার মাধ্যমে চিঠি এক খানা পাঠালো।

শুক্তি চিঠিটি পেয়ে অতি সঙ্গোপনে খুলে উল্টে – পাল্টে দেখল। কিন্তু সে কি! এতো কেবল একটি সাদা কাগজ। কী বুঝাতে চেয়েছে। সাদা দিলের মানুষ! নাকি অন্তঃসারশূন্য।
সেও পত্রের উত্তর দিলো। আনোয়ারা বিশ্বস্ত কাসেদের ন্যায় আনুপের নিকট সেটি হস্তান্তর করল।
আনুপ পত্রোত্তর পেয়ে উচ্ছ্বসিত। মুন্নি, মিষ্টির আর আনোয়ারার প্রতি সন্দেহ দূর হলো।
নির্জন স্থানে গিয়ে আনুপ চিঠিটি খুলল। একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছাড়া কিছুই লিখা নাই। যেমন পত্রের তেমন উত্তর।
পত্র আদান – প্রদানে আনোয়ারা, মিষ্টি আর মুন্নি খুবই খুশি। তারা জানে না আনুপ আর শুক্তি পরস্পর পরস্পরকে কী লিখেছে।
একদিন আনুপ আনোয়ারাকে বলল, “তোর বান্ধবীর সাথে দেখা করতে চাই। কোথায়, কীভাবে সাক্ষাত হবে জিজ্ঞেস করে জানাইয়ো”।
দুই দিন পর আনোয়ারা শুক্তির সাথে দেখা করার সময় ও স্থান জানালো।
কথা মতো আনুপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙ্গিনায় বিকাল চারটায় উপস্থিত। চারদিকে দেখছে। শুক্তি আসছে কি না।

না,দেখা যাচ্ছে না । আধ ঘন্টা হলো। আসবে না মনে হয়। আভিজাত্যের চাদরের মোড়কে বেড়ে উঠা বিত্তশালী ঘরের মেয়ে দরিদ্র কৃষক পুত্রের সাথে দেখা করতে আসবে পাগলেও বিশ্বাস করবে না। আমার বিশ্বাস করাটাই বোকামি হয়েছে।
আনুপ প্রস্থান করবে এমন সময় নিচ থেকে পাহাড়ে ঢালু বেয়ে একটি মেয়ে উপরের দিকে আসতে দেখে থামল। আরো কাছাকাছি আসলে আনুপ লক্ষ্য করল, পাহাড়ের ঢালুতে হাঁটার দৃশ্য যেন কায়াতরু। যৌবনোম্মুখী সুন্দর ছিপছিপে গড়ন আর অধরপল্লব বিশিষ্ট একটি মেয়ে। আরো কাছে আসলে আনুপ নিশ্চিত হলো পরীক্ষার হলে দেখা ময়ূরাক্ষীর সেই শুক্তি। নিকটে এসেই অধরপল্লব এর কোনায় কিঞ্চিৎ হাসির স্বপ্নিল রেখা ছড়িয়ে বলল- সরি একটু লেইট হয়ে গেল। অনেক অজুহাত দেখিয়ে বের হতে হলো। তো কেমন আছেন?
আনুপ- ভালো। আপনি যে আসবেন আমি বিশ্বাস করতে পারি নাই।
শুক্তি- আমাকে তুমি বললে খুশি হব। না দেখেই কল্পনায় যার ছবি এঁকেছি, তার বিশ্বাসও নিশ্চয় অর্জন করতে পারব।
আনুপ – কিন্তু তোমার- আমার মাঝখানে একটি আকাশচুম্বী দেওয়াল আছে। সেই দেওয়াল টপকানোর মতো আত্মবিশ্বাস যে আমার নেই।
শুক্তি- আমি সাহায্য করব।আপনি শুধু ভালো রেজাল্ট করেন আর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাকিটা আমি দেখব। আমার বাবা মেধাবী ছাত্রদের খুব পছন্দ করে।

এই কথা শুনে আনুপ অজনা এক মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। আনুপ কিছু বলবে এমন সময় শুক্তি বলল- ভাবনার সময় অনেক আছে। আজকে আসি। আপাতত এভাবে আর দেখা হবে না।
– যদি দেখতে ইচ্ছে করে।
মাসের শেষ শুক্রবার বিকাল পাঁচটায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবেন। আমি ঐ সময়ে বের হয়ে দেখা দেবো। নিজকে এ্যাস্টাবিলিস্ট করেন। বাই —- বাই।

শুক্তি চলে যাওয়ার পর আনুপ শূন্যে তাকিয়ে নিজে নিজে বলে উঠল- এই আকাশ আর পাহাড় সাক্ষী রইল। আজ আনুপের একটি হৃদয় আর একটি হৃদয়ের সান্নিধ্য লাভ করল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। কালো আঁধার নেমে আসছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। পৃথিবীকে আজ আনুপের অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
তিন মাসে তিন শুক্রবার বিকেলে আনুপ দূর থেকে শুক্তিকে দেখেছে। খোরশেদ সাইকেল চালাত আর আনুপ কেরিয়ার-এ বসে শুক্তি দর্শনে যাত্রা করতো। এ যেন তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের প্রান্ত দেখার মতো বিশাল জলরাশির যতটুকু দেখা যায়।

আনুপের রেজাল্ট এর সংবাদ শুনে শুক্তি ভীষণ আনন্দিত। যে রুপ রেজাল্ট সে আশা করছিল, ঠিক সেই রকম হয়েছে।
আনোয়ারা, মিষ্টি ও মুন্নির সাথে পরামর্শ করে শুক্তি ঠিক করল, আনুপকে সারপ্রাইজ দিবে। বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির পর চার জন মিলে আনুপের বাড়িতে গিয়ে অভিনন্দন জানাবে। ঐসময় আনুপ সচরাচর বাড়িতেই থাকে।
পরিকল্পনা মোতাবেক চার বান্ধবী স্কুল থেকে সরাসরি আনুপের বাড়িতে হাজির।

আনুপের বাড়িটি মাটির দেওয়াল আর নারার(খড়ের) ছাউনি। চার পাশেই বারান্দা। পূর্ব পাশের বারান্দায় আনুপ থাকত। এই বছর মেট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপ এর জন্য টাকা মিলাতে গিয়ে আনুপের বাবা পর্যাপ্ত নারা কিনতে পারে নাই হেতু পূর্ব পাশের বারান্দার চালে ছাউনি দেওয়া সম্ভব হয়নি। কাল বৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে দেওয়ালটি মাটিতে মিশে গেছে। বারান্দার চালটিও ভেঙ্গে নিচে পড়ে গেছে। আনুপ এখন দক্ষিণ পাশের বারান্দায় থাকে। একটি সিঙ্গেল খাট। খাটের পাশেই পড়ার টেবিল। টেবিলে এলোমেলো বই। টেবিলের সামনে দেওয়ালে ঝুলছে আনুপের একটি বাঁধানো ছবি। এই ছবিটি খোরশেদ আনুপকে বাঁধাই করে দিয়েছিল।

শুক্তি আনুপের ছবিটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিষ্টি বলল, একটু অপেক্ষা করো, বাস্তবে দেখতে পাবে। আনুপের মা এসে বলল, এই মেয়েটি তো চিনলাম না। আনোয়ারা উত্তর দিল আমাদের সাথে পড়ে। শেখ নাজিম উদ্দিন মাস্টারের মেয়ে। ওমা! এত বড় লোকের মেয়ে আমার ঘরে। মা, বসো। কী দেবো তোমাদের বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে চার বান্ধবীকে খেতে দিলো। চা’র সাথে বাহার বিস্কুট দিলো। আনুপের মা নিজেও এক কাপ নিল। চা- বিস্কিট খেতে খেতে মিষ্টি জিজ্ঞেস করল, আনুপ ভাইয়া কোথায়?
সকালে বের হয়েছে। এখনো ফিরে নাই।
আনোয়ারা শুক্তিকে দেখিয়ে আনুপের মাকে বলল, বুবু এইটাকে বউ বানালে কেমন হয়।
ভালই তো হবে। শরিফ ঘরের মেয়ে। ধনী বাবার ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকারিণী। ছেলেকে কিছুই করতে হবে না। তাছাড়া এমন সুন্দরি কন্যা যে ঘরের বউ হবে, সে ঘরে আলো ছড়াবে।
এই কথা শুনে শুক্তির ফর্সা চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

আনুপের মায়ের পজিটিভ উত্তর শুনে মিষ্টি বলল, “আনুপ ভাইয়া আর শুক্তি দু- জন দু-জনকে ভালোবাসে”।
-তাই নাকি!
তিন বান্ধবী একসাথে বলে উঠলো, সত্যি।
আনুপের মা’র চেহারা মুহুর্তের মধ্যে মলিন হয়ে গেল। দু- চোখ থেকে দু ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
শুক্তিকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, ও– মা জননী তুমি একটু আমার সাথে আস।
শুক্তিকে নিয়ে পূর্ব পাশের ভাঙ্গা বারান্দার ধারে গেল। আর বলল- এই বারান্দায় এই বছর অভাবের কারণে ছাউনি দিতে পারিনি। বৃষ্টির পানিতে দেওয়াল ধ্বসে মাটিতে মিশে গেছে, চাল ভেঙ্গে কী অবস্থা হয়েছে দেখ। মা জননী, তুমি উচ্চবংশীয় ঘরের মেয়ে।তোমরা দুই জনই মারাত্মক ভুলের মধ্যে আছ। তোমার বাবা- মা শুনলে খুব কষ্ট পাবে। এমন কি স্ট্রোকও করতে পারে। তুমি আমাকে ওয়াদা দাও, আজ থেকে এই ভুল পথ থেকে সরে আসবে। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তা শুক্তির কল্পনাতীত ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় শুক্তিও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে প্রতিশ্রুতি দিলো, সে ভুল পথ থেকে সরে আসবে।
আনুপের বাড়ি থেকে ফেরার পথে শুক্তির বিষণ্ণ বদন দেখে আনোয়ারা জিজ্ঞেস করল কী হয়ছে? বুবু একা নিয়ে তোমাকে কী বলেছে?
শুক্তি- সেটি বলা যাবে না।
আনোয়ারা – যাগগে, তোমরা শাশুড়ি – বউয়ের কথায় আমাদের নাক গলানোর কী আছে।

এত কিছু ঘটে গেল। আনুপ তার কিছুই জানে না।
আনুপ কল্পনায় সাইকেলের কেরিয়ারে বসে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, এই মাসের শেষ শুক্রবার বিকেলে শুক্তির বাড়ি অতিক্রম করার সময় শুক্তি উঠানে দাঁড়িয়ে তার কর উপরে তোলে দুই আঙ্গুল ফাঁক করে ভি চিহ্ন দেখিয়ে ভাল রেজাল্টের জন্য উইশ করছে।

কাঙ্ক্ষিত সেই শুক্রবার আসলো। বিকলে সাইকেলযোগে খোরশেদ সমেত আনুপ শুক্তির বাড়ি অতিক্রম করল। কিন্ত শুক্তির দেখা মিলল না। খানিকক্ষণ পর ঘুরে আবার বাড়ির সামনে দিয়ে ধীরে সাইকেল চালিয়ে ফিরল। না। শুক্তির ছায়াও দেখা গেল না।
আনুপ খোরশেদ কে বলল, কোন অসুখ- বিসুখ হয় নাই তো।
পরের মাসেও একই অবস্থা।
আরো দু একবার খোরশেদকে ছাড়া আনুপ একা গিয়ে দেখেছে কিন্তু শুক্তি নামের স্বপ্ন দেখানো সেই মেয়েটির দেখা আর মিলেনি।
আনুপের কল্পনার রাজ্যে সদা বিরাজমান শুক্তি আর শুক্তি। সে ভাবে হয়তো তার দেখা আর কখনো মিলবে না। এজন্যই কি কাজী নজরুল ইসলাম লিখে গেছেন, ” নারী শুধু ইঙ্গিত, সে প্রকাশ নয়। সমুদ্রের জলে আমরা যতটুকু নামতে পারি, নারীর মাঝেও ডুবি ততটুকুই। সে সর্বদা রহস্যের পর রহস্য-জাল দিয়ে নিজেকে গোপন করেছে- এই তার স্বভাব। ওদের অনুভব করো, দেখো কিন্তু ধরতে যেয়ো না”।
কিন্তু আজকে আমার ধরতে যাওয়ার চিন্তা করা তো দূরের কথা, দেখাও মিলছে না।

আনুপ কিছুদিন বিষণ্ণতায় নিমজ্জিত ছিল। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নতুন আঙিনা, নতুন পরিবেশ, নতুন বই এবং নতুন শিক্ষক- শিক্ষিকার জীবন গড়ার স্বপ্নময় লেকচার শুনে ধীরেধীরে বিষণ্ণতা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো। নবোদ্যমে মনোনিবেশ করল পড়ালেখায়। পাশাপাশি আর্থিক সচ্ছলতা আনয়নে শুরু করল টিউশনি ও মৎস্য চাষ। দেখতে শুরু করল জীবন গড়ার স্বপ্ন।

লেখক-
অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।
তারিখ- ২০/১১/২১ খ্রিষ্টাব্দ

————
লেখকের প্রত্যাশা –
১)এস এস সি পরীক্ষা চলমান। এইচ এস সি পরীক্ষা শুরু হবে। আনুপ আর শুক্তির মতো কোন শিক্ষার্থী অপ্রাপ্ত বয়সে ভুল পথে যেন পা না বাড়ায়।
২) প্রত্যেক অভিভাবক তাঁদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের প্রতি নজর রাখবেন। যাতে তারা পথভ্রষ্ট না হয়।
৩) কারো স্বপ্ন ভঙ্গ হলে আত্মবিশ্বাস যেন না হারায়।
————-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *