ঢাকা, বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক
উখিয়া নিউজ ডেস্ক :

২০১৭ সালের এক রাতে মিয়ানমারের মংডুতে সামরিক বাহিনীর দেওয়া আগুনে নিজের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখেছিলেন আজিজ। জীবন বাঁচাতে পাহাড়-নাফ নদী পেরিয়ে চলে এসেছিলেন বাংলাদেশের কুতুপালং ক্যাম্পে। জীবন থেকে সংগ্রামের অধ্যায় মুছে না গেলেও, ক্যাম্পকে নিরাপদ মনে করেছিলেন তিনি।

কিন্তু অপরাধমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনাকীর্ণ ক্যাম্পের রাতগুলোও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

আজিজ  বলেন, ‘যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে বলে আমরা প্রতিটা রাত আক্রমণের ভয়ে কাটিয়ে দিই। নিরাপদ আশ্রয় (রোহিঙ্গা শিবির) ক্রমেই আমাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। আমরা জীবন বাঁচাতে মিয়ানমার ছেড়েছি। কিন্তু এখনও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের শত্রু। কিছু অপরাধীর কারণে ক্যাম্পের পরিবেশ ভীতিকর হয়ে উঠেছে।’

রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারীদের অনেকেই আজিজের মতো আতঙ্কিত। কারণ সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সেখানে প্রায় সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই ঘটে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অপরাধীরা মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, মানব পাচার, অপহরণ থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি ও জমি নিয়ে লড়াই- সবই চালায় রাতের অন্ধকারে।

পরিস্থিতি কেমন দাঁড়িয়েছে, গত ১ অক্টোবর রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্যাম্প জুড়ে টহল জোরদার করতে, বিশেষ করে রাতে টহল জোরদার করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে প্রতি রাতেই ব্লক অভিযান চালাচ্ছে তারা।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহকে (৪৮) গত ১ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে কুতুপালং ক্যাম্পে তার কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া, গত শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ৬ রোহিঙ্গার নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবির জুড়ে সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যকার উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

একটি অভিযানের পরপরই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এ ঘটনায় গত শনিবার সাড়ে ১১টার দিকে মামলা হয়েছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং উখিয়া পুলিশ বেশ কয়েকটি অভিযানে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

নিহত আজিজুল হকের বাবা নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে ২৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয়ের প্রায় ২৫০ জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলাটি করেন।

গ্রেপ্তারদের নাম দিলদার মাবুদ ওরফে পারভেজ, মোহাম্মদ আইয়ুব, ফেরদৌস আমিন, আব্দুল মজিদ, মোহাম্মদ আমিন, মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে ফয়েজ, জাফর আলম, মোহাম্মদ জাহিদ, মোহাম্মদ আমিন ও মুজিবুর রহমান বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহমেদ সঞ্জুর মোর্শেদ।

এপিবিএন -১৬ এর কমান্ডার মো. তারিকুল ইসলাম তারিক  বলেন, `আমরা রাতে টহল বাড়িয়েছি। তবে এরপরও হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে মনে হচ্ছে।’

উখিয়ার তুলনায় টেকনাফ এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো বলে উল্লেখ করেন তিনি। `

শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, `ক্যাম্পে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি চালাবে।’

বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, অন্তত ১০টি রোহিঙ্গা গোষ্ঠী হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক পাচার ও ডাকাতিসহ কমপক্ষে ১২ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে অন্তত ২৬৬ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন এবং ২ হাজার ৮৫০ জনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার  বেশিরভাগই হয়েছে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে।

এপিবিএনের ৩টি ব্যাটালিয়ন রোহিঙ্গা শিবিরে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ২০১৭ সালে ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকে ১ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন সেখানে।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, `আমি বারবার বলে আসছি, রোহিঙ্গারা এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে। মূলত মিয়ানমার থেকে আসা জঙ্গি গোষ্ঠী এখানে সমস্যা তৈরি করছে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, `রোহিঙ্গাদের চলাচল বন্ধ করতে সরকার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে যাচ্ছে। ওয়াচ টাওয়ারগুলোর নির্মাণকাজও প্রায় শেষ। সেগুলো কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্প এলাকায় বিজিবি সদস্যদের স্ট্যান্ডবাই রাখা হবে এবং ক্যাম্পের মধ্যে টহল বাড়ানো হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, `অপরাধীরা মিয়ানমারের মোবাইল সিম ব্যবহার করে। আমরা ইতোমধ্যে বিটিআরসিকে অবিলম্বে এগুলোর নেটওয়ার্ক ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *