ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ০৪:৪৫ অপরাহ্ন
রোহিঙ্গা অপরাধীরা মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করছে
হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া ::

একের পর এক হত্যাকান্ড, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও অগ্নিসংযোগের মতো ভয়ংকর এক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কথিত আরসা, আল ইয়াকিনসহ কমপক্ষে ১৫টি অপরাধী দল সক্রিয়। এসব অপরাধী দলের নেতৃত্বে চলে মাদক কারবার, চুরি ডাকাতি, অপহরণ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ। তাদের ভয়ে মুখ খুলতে পারেনা সাধারণ রোহিঙ্গারা। এসব অপরাধ করতে রোহিঙ্গা অপরাধীরা বেছে নিচ্ছে মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক। প্রথমত অপরাধী চক্রের সদস্যরা মিয়ানমারের সিমকার্ড ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অপরাধের পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্যাম্পের ভেতরে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অপরাধ ঘটানোর জন্য তারা ওয়াকিটকি ব্যবহার করছে। ফলে অপরাধ করার পরও নিরাপদে গা-ঢাকা দিতে পারছে এসব অপরাধী।
আতঙ্কে সাধারণ রোহিঙ্গারাঃ
গত ২৯ আগস্ট উখিয়ায় লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলি চালিয়ে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তারা এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে। এ খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের কথা জানায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান-এপিবিএন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ হত্যা মিশনে অংশ নেয় ১৯ জন। এদের মধ্যে পাঁচজন ছিল অস্ত্রধারী। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দুই মিনিটেই কিলিং মিশন শেষ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে খুনিরা। গত ২০ অক্টোবর ১৮ নম্বর ময়নাঘোনা ক্যাম্পে গুলি করে ছয়জনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তারা সবাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক। মূলত এই দুইটি ঘটনার পর আতঙ্ক বেড়েছে ক্যাম্পে। ১৯ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসান আলী বলেন, মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যার পর থেকে আমরা আতঙ্কে ছিলাম। এরপর আবার পাশের ক্যাম্পে ছয়জন খুনের পর আমরা পরিবার নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছি। ৮ এপিবিএন পুলিশের রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। পুলিশের সাথে রোহিঙ্গারাও যোগ দেয়। এতে কিছুটা প্রশান্তি এলেও সাধারণ রোহিঙ্গারা খুবই আতঙ্কে আছে।
অবাধে ওয়াকিটকির ব্যবহার করছে অপরাধীরাঃ
কক্সবাজার র‌্যাব ১৫ এর একটি দলের হাতে গেল বছর অক্টোবরের দিকে ৮টি ওয়াকিটকিসহ দুই রোহিঙ্গা গ্রেফতার হয়। তারা এসব ওয়াকিটকি ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল বলে স্বীকারোক্তিও দেয়। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সময় অভিযানে বেশ কিছু ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। রোহিঙ্গা নেতা হামদ উল্লাহ জানান, অসংখ্য রোহিঙ্গা দুবৃত্তের হাতে ওয়াকিটকি রয়েছে। যে কোন অপরাধ কর্মকান্ডের আগে যোগাযোগ রক্ষায় এসব ওয়াকিটকির ব্যবহার বাড়িয়ে দেয় অপরাধীরা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মোবাইল সেবাদাতাদের সিম নেটওয়ার্ক সিগন্যাল অনেক সময় ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায় না। সেসব এলাকায় ওয়াকিটকিই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এসব ওয়াকিটকি ও মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ক্যাম্পে অপরাধীদের তৎপরতা অনেকাংশে কমে আসবে। ১৪-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন-১৪) অধিনায়ক (এসপি) মো, নাইমুল হক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশি নেটওয়ার্কের পরিবর্তে ভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকে। এ কারণে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া কষ্টসাধ্য। আমরা বিভিন্ন সময় এর প্রমাণ পেয়েছি। তবুও এসব অপরাধীদের শনাক্তে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
বাড়ছে অস্ত্রের ব্যবহারঃ
শুধু মহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডই নয়, এর আগেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময় সেখান থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় অস্ত্র মামলা হয়েছিল ১৩টি। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১৭টি। ২০২০ সালে ২৭টি অস্ত্র মামলা হয়। ২০২১ সালে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ১৫টি অস্ত্র মামলা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১৪টি দেশীয় পিস্তল, ৪৪টি এলজি, তিনটি বিদেশী পিস্তল, ৩০টি একনলা বন্দুক, ২৫টি দেশী বন্দুক, চারটি পাইপগানসহ প্রচুর পরিমাণ ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
৮ এপিবিএন পুলিশের অধিনায়ক (এসপি) মো: সিহাব কায়সার খান বলেন, ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারী উখিয়ার ১১ টি ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় ৮ এপিবিএন। ১১ টি ক্যাম্পে সাড়ে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাস।
ক্যাম্পে ৫ টি পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে এবং আরও ২ টি নির্মাণাধীন। গত এক বছরে ১ কেজি স্বর্ণালংকার, ৮ লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবা, ৮ টি আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও ১৩২ টি এলজি, ২৬ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৫৮ লক্ষ ৬ হাজার বাংলাদেশী টাকা, জাল নোট ৫০ হাজার, ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার মিয়ানমার মুদ্রা বা কিয়াট জব্দ করা হয়েছে।
এ সময় ১৮ নং ক্যাম্পে মাদরাসায় ৬ জন হত্যাকাণ্ডের মূল আসামিসহ তালিকাভূক্ত ৪৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এপিবিএন পুলিশ। তব সবচেয়ে বেশী সফলতা আসছে পালাক্রমে ৭৭৩ টি সাব ব্লকে রাত্রিকালীন পাহারায়। প্রতি ১৯ দিন পর একজন রোহিঙ্গা একরাতের জন্য নিজ নিজ ব্লক পাহারা দিচ্ছে স্বেচ্ছায়। এতে অপরাধ হ্রাস পেয়ে রোহিঙ্গারা স্বস্তিতে থাকতে পারছে, আর আইন শৃংখলা পরিস্থিতিরও ক্রমোন্নতি ঘটছে বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *