ঢাকা, সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
প্রতিদিন অর্ধশতাধিক রোগী দেখেন হাত-পা হারানো জব্বার
ডেস্ক রিপোর্ট ::

১৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের একটি কক্ষ। চারপাশে ইটের দেয়াল, ওপরে টিনের চাল। কক্ষটির ভেতরে তিনটি কাঠের আলমারি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। দোকানে গদিযুক্ত একটি ফোমের চেয়ারে বসে আছেন প্রবীণ এক ব্যক্তি। তার পাশে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা মধ্যবয়সী এক নারী।

ফোমের চেয়ারে বসা ব্যক্তিটির নাম জব্বার হাওলাদার (৫৯)। এলাকার সবাই তাকে জব্বার ডাক্তার (পল্লী চিকিৎসক) হিসেবে চেনেন। পাশের প্লাস্টিকের চেয়ারে যে নারী বসা তার নাম হেলেনা বেগম (৫২)। তিনি জব্বারের স্ত্রী।

তবে জব্বার হাওলাদার আর দশজনের স্বাভাবিক সুস্থ নন। তার দুই হাত কনুই থেকে ও দুই পা হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। গ্যাংরিন (পচনশীল ক্ষত) রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ২১ বার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রথমে বাম পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে শুরু করে কাটতে কাটতে হাঁটু থেকে দুই পা এবং পরবর্তীতে কনুই থেকে দুই হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। হাত-পা না থাকলেও তিনি জীবন সংগ্রামে থেমে নেই। পল্লী চিকিৎসক হিসেবে এলাকার মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, ফরিদপুর শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ভাঙ্গা সদর চৌরাস্তা। সেখানে থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ১৬ কিলোমিটার গেলে পুলিয়া বাজার। পুলিয়া বাজার থেকে দক্ষিণে অটোরিকশায় চার কিলোমিটার গেলে ভাঙ্গার আজিমনগর ইউনিয়নের শিমুলবাজার। শিমুলবাজারে বিভিন্ন পণ্যের তিন শতাধিক দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ওষুধের দোকান রয়েছে অন্তত ১০টি । এর মধ্যে একটি ওষুধের দোকানের নাম আল-আমিন ফার্মেসি। ওই ওষুধের দোকানটি জব্বারের।

এ অঞ্চলের লোকের জ্বর, ঠান্ডা, হাঁচি-কাশি, এলার্জিজনিত ছোটখাট সমস্যা, পেটের পীড়া বা মাথা ব্যথাসহ ছোটখাটো সকল রোগের সমাধান মেলে আল-আমিন ফার্মেসিতে গেলে। সেখানে ওষুধের ব্যবস্থাপত্রের জন্য কোনো টাকা নেন না জব্বার। পাশাপাশি ওষুধও ওই ফার্মেসি থেকেই কেনা যায়।

স্ত্রীর সঙ্গে জব্বার হাওলাদার

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজিমনগর ইউনিয়নের কররা গ্রামের ময়েজ হাওলাদের চার ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে জব্বার সবার বড়। ১৯৮৪ সালে স্থানীয় পুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৫ সালে ২২ বছর বয়সে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার চন্দ্রিবরদী গ্রামের হেলেনা বেগমকে বিয়ে করেন। ১৯৮৬ সালে ছোট ভাই জলিল হাওলাদারের পাখি রাখার খাঁচা বানাতে বাঁশ কাটতে গিয়ে অসাবধানতাবসত বাম পায়ের বৃদ্ধা আঙুলে দায়ের কোপ লেগে সামান্য কেটে যায়। পরে ইনফেকশন দেখা দেয়।

ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে (বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) চিকিৎসক দেখানো হলে তাকে খাওয়ার জন্য কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। এতেও তার গ্যাংরিন সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ১৯৮৭ সালে বাম পায়ের বৃদ্ধা আঙুলসহ দুটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়। এই অস্ত্রোপচার করা হয় ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে। তবে সংক্রমণ এখানেই থেমে যায়নি। পায়ের দুটি আঙুল হারিয়ে এলাকায় এসে টিউশনিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন জব্বার। এলাকায় ভালো ছাত্র হিসেবে তার সুনাম থাকায় তার টিউশনির প্রসার ঘটতে থাকে। পুলিয়া, কররা, জাঙ্গালপাশাসহ আশপাশের পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন তিনি। পাশাপাশি তার গ্যাংরিনের সংক্রমণ বাড়তেই থাকে।

১৯৯৫ সালের শুরুর দিকে ডান হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধা আঙুলে তিনি ঘা দেখতে পান। লেখার জন্য কলম ধরার কারণে ডান হাতের আঙুলের যে দুই অংশে বেশি চাপ লাগে সেখানেই প্রথমে ঘা দেখা দেয়। যা দ্রুত ছড়িয়ে পরে এক আঙুল থেকে অন্য আঙুলে, পায়ের ও হাতের কবজি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। তখন অস্ত্রোপচার করে সেসব আঙুল কেটে ফেলা হয়। এভাবে এক আঙ্গুল থেকে আরেক আঙুল অস্ত্রোপচার করে কাটতে কাটতে ২০ বার অস্ত্রোপচার করেও গ্যাংরিনের সংক্রমণ কমেনি।

পরে ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১তম অস্ত্রোপচার করে তার দুই পা হাঁটু থেকে এবং দুই হাত কনুই থেকে কেটে ফেলতে হয়। টানা তিন বছর ধরে খেতে হয় ওষুধ। এখন প্রতিবন্ধী হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন জব্বার হাওলাদার।

জব্বার হাওলাদারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তার চিকিৎসায় প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। হাত-পা হারিয়ে প্রতিবন্ধী হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি।

জব্বার ঢাকা পোস্টকে জানান, তিনি কারো মুখের দিকে চেয়ে থাকতে চাননি। সব সময় শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে আত্ম-কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেছেন। ১৯৯৯ সালে তিনি পুলিয়া বাজারের রোকন আকন্দের মালিকানাধীন আল-আমিন ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির কাজ শেখা শুরু করেন। যেখানে তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত ওষুধের নাম, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। এর ভেতরেই ২০০২ সালে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার লোকাল হেলথ অ্যান্ড পিপলস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি থেকে ছয় মাস মেয়াদি এলএমএএফ (লোকাল মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি) পাস করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *