ঢাকা, রবিবার ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন
জন্ম নিবন্ধন মানেই কি ভোগান্তি?
ডেস্ক রিপোর্ট ::

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদাহ ইউনিয়নে জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধন করতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। জন্ম নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে।

জানা গেছে, ঘটনাটি প্রায় দশ থেকে পনের দিন আগের। সরদহ ইউনিয়নে জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে এক সেবাগ্রহীতা সেখানে অনিয়ম দেখতে পান। এ কারণে তিনি গোপনে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এ সম্পর্কে অভিযোগ করেন। পরে তাতেও কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের ভিডিওটি প্রদান করেন। এরপরই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। এতে স্থানীয় মহলে বেশ আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি কম্পিউটার, প্রিন্টার ও স্ক্যানার প্রদান করেছে এবং সেখানে একজন প্রশিক্ষিত যুবককে উদ্যোক্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদের কাজ হচ্ছে জন্মনিবন্ধন করতে আসা ব্যক্তিদের কাগজপত্রাদি নিয়ে তা বিনা খরচে নিবন্ধন প্রক্রিয়া করে দেয়া। তবে কোথাও কোনো মেইল পাঠানো, প্রিন্ট কিংবা কম্পোজ করলে তাতে আলাদা সামান্য অর্থ নিতে পারবেন। এর বাইরে সেই উদ্যোক্তা কোনো টাকা নিতে পারবেন না। অর্থাৎ ফ্রি জন্ম নিবন্ধনসহ ইউনিয়নের অন্যান্য কাজ করে দেবেন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাজশাহীর সরদহ ইউনিয়নে কর্মরত উদ্যোক্তা নাহিদ পারভেজ তুষার জন্ম নিবন্ধনের কাগজাদি জমা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকা দাবি করছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যাচ্ছে, ‘এটা কবে দেবো ঠিক নাই। দুই মাসও লাগতে পারে, দুই বছরও লাগতে পারে। শর্তে রাজি থাকলে কাগজপত্র দিয়ে যান। সাথে চারশ টাকা দেন।’

সেখানে ভুক্তভোগীকে বলতে শোনা যায়, ‘দুই মাসও লাগতে পারে ঠিক আছে, কিন্তু দুই বছর লাগলে কিভাবে হবে। কিভাবে কাজ হবে।’

তারপর উদ্যোক্তা তুষার আবার বলেন, ‘দুই মাসও লাগতে পারে, দুই বছরও লাগতে পারে। শর্তে রাজি থাকলে কাগজপত্র দিয়ে যান। সাথে চারশ টাকা দেন।’

ইউনিয়ন পর্যায়ে এমন অতিরিক্ত অর্থ দাবির কারণে বেকায়দায় পড়েছেন সরদহ ইউনিয়নের বাসিন্দারা। অথচ জন্ম নিবন্ধনের জন্য উপজেলার মডেল ইউনিয়ন এটি। সেখানে সনদ দিতে সরকারি ফির আট থেকে দশ গুণ টাকা আদায় করা হচ্ছে।

এরপরও সেখানকার উদ্যোক্তার বক্তব্য, জন্মসনদ পেতে দুই বছরও লাগতে পারে। বেপরোয়া অর্থ আদায় ও ইচ্ছা করে সময় ক্ষেপণের কারণে সেবা নিতে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। টাকার কারণেই অনেক অভিভাবক এখনো জন্মসনদ সংশোধন করাতে পারেননি।

স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য ১০০ টাকা ও জন্ম তারিখ ব্যতীত পিতার নাম, মাতার নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন ফি ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধনের পর সনদের কপি বিনা ফিতে সরবরাহের কথাও বলা হয়েছে।

সরেজমিন উপজেলার সরদহ ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, জন্মসনদ পেতে প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিলে চারশ থেকে পাঁচশ টাকাও দাবি করছেন সেখানকার উদ্যোক্তা। কিছু টাকা কম দিতে চাইলে আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি জন্মসনদ পেতে দুই বছর লাগবে মর্মে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সেখানে সেবা নিতে আসা ওই ইউনিয়নের কলেজছাত্র সজীব ইসলাম অভিযোগ করে বলে, আমার বাবা-মা এবং আমার জন্ম সনদ সংশোধনের জন্য সরদহ ইউনিয়ন পরিষদে এসেছিলাম। ইংরেজি সংশোধনের জন্য তারা আমার কাছ থেকে ৬০০ টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া বাবা-মায়ের নাম ও জন্মতারিখের দুই জায়গায় ভুল থাকায় আরও ৩০০ টাকা নিয়েছে। জন্ম নিবন্ধন মানেই কি তাহলে ভোগান্তি? প্রশ্ন করে ওই শিক্ষার্থী।

ওই ইউনিয়নের বিলকিস বেগমও করেছেন একই অভিযোগ। তিনি বলেন, আমার ছেলে-মেয়েদের স্কুলের জন্য চারটি জন্ম সনদ সংশোধন করেছি। তারা আমার কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে মোট ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছে। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত আবেদন জমা নেয়নি। এ রকম টাকার দাবি করলে ইউনিয়নে সেবা নিতে আসা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় সরদহ ইউনিয়নের উদ্যোক্তা নাহিদ পারভেজ তুষারের সঙ্গে। টাকার নেওয়ার পরও জন্ম সনদ পেতে দুই বছর লাগবে এমন উক্তির বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।

তবে তার ভাষ্য, ‘আমি ফাইজলামি করে এক বন্ধুকে বিষয়টি বলেছিলাম। সেটাই হয়তোবা কেউ গোপনে ভিডিও করে ফেলেছে, বুঝতে পারিনি। তবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় না।’

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে সরদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান মধু বলেন, ‘এ বিষয়টি আমি একেবারেই জানি না। কেউ আমাকে অভিযোগও দেয়নি। আপাতত আমি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছি। নির্বাচন শেষ হোক তারপর তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা সামিরা বলেন, ওই উদ্যোক্তার কথা বলার আচরণ ও ধরন কোনোটাই ভালো না। এমনকি ওই উক্তিটি করার মতো তার কর্তৃত্বও নেই। বিষয়টি জানার পর আমি তাকে ডেকে কড়াভাবে শাসন করেছি। এর বেশি কিছু করার এখতিয়ারও আমার নেই।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে রাজশাহীর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শাহানা আখতার জাহান বলেন, আমি এখন ঢাকায় একটি সেমিনারে আছি। মিটিং শেষে কথা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *