ঢাকা, বুধবার ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০২:২৯ পূর্বাহ্ন
কক্সবাজারে কোটি টাকার জমি নিয়ে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতার দ্বন্দ্ব
মানবজমিন ::

কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গড়ে ওঠা শুঁটকি মার্কেটের কোটি টাকার জমির দখল নিয়ে বিরোধের জেরে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মোনাফ সিকাদারকে গুলি করে হত্যা চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় মামালাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠে পর্যটন শহর কক্সবাজার। এই ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। গুলি ও মামলার জের ধরে বড় ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের আশংকা করছে কক্সবাজারবাসী।

গত ২৭ অক্টোবর গুলির ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানকে নির্দেশদাতা হিসেবে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রোববার মামলাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে সড়ক অবরোধ ও বিশৃংখল সৃষ্টি করে মুজিব অনুসারীরা। পৌরসভায় সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দেয় পৌর পরিষদ। আতংকে অনেক পর্যটক কক্সবাজার ত্যাগ করেছেন।

পরে উর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে অবরোধ ও বন্ধ সেবা চালু হলেও মামলার সুরাহা হয়নি। গুলির ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
তবে মোনাফ সিকদারকে গুলি করার রহস্য ধীরে ধীরে খোলাসা হচ্ছে।

উঠে আসছে নেপথ্যে নায়কদের নামও। কোথায় বৈঠক করে মোনাফকে গুলি করে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়েছে তাও প্রকাশ পাচ্ছে। এক টোকাইকে দিয়ে গুলি করা হলেও, ঘটনায় তদারকি করেছেন চিহ্নিত অপরাধী ও গডফাদাররা। এমনটি তথ্য মিলেছে গোয়েন্দা তদন্তে।

গোয়েন্দা তথ্যে পাওয়া সূত্রে জানা গেছে, মোনাফকে গুলি করার আগে শ্রমিকলীগ নেতা ও মেয়র মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারি হিসেবে পরিচিত সোহেল রানার নেতৃত্বে একাধিকবার গোপন বৈঠকে মিলিত হয় সন্ত্রাসীরা। কলাতলী একটি ভাড়ায় চালিত হোটেলে এ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে রানা ছাড়াও সাবেক যুবদল নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সবুজ, চিহ্নিত সন্ত্রাসী মুহাম্মদ মিজান ওরফে লম্বা মিজানসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মোনাফকে হত্যার মিশন বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেয়া হয় সবুজ ও মিজানকে। ঘটনার তিনদিন আগে মিজান ও সবুজ শহরের পাহাড়তলীর এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল কিনেন। পরে বাদশাঘোনা এলাকা থেকে একজন দুর্ধর্ষ টোকাইকে শুটার হিসেবে ভাড়া করে চক্রটি।

গোয়েন্দা তথ্যে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার আগে মোনাফদের দখল করা শুটকি মার্কেটের সামনে বেশ কয়েকদিন গিয়ে লম্বা মিজান আশপাশের পরিস্থিতি অবলোকন করে আসেন। এটাও দেখে আসেন মোনাফ কোন সময়ে সেখানে আড্ডা দেন এবং তার সাথে লোকজন কখন কম থাকে। ঘটনার দিন মোনাফের সাথে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া তারেকও মিজান চক্রের একজন। তারেক ওই মার্কেট এলাকায় নিয়মিত অবস্থান করে মোনাফ কোথায় যাচ্ছেন, কি করতেছেন তার তথ্য সরবরাহ দিতেন। ঘটনার দিন শুটারের সাথেই তারেককে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে তারেকও গুলিবিদ্ধ হয়ে যান। কিন্তু গুলি করে পালিয়ে যাওয়া শুটার তার অপরাধ জড়তে একাধিক নামে পরিচিত হওয়ায় তার আসল নাম কি? সেটা কেউ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি।

অপরদিকে, হত্যার পরিকল্পনায় থাকা ও মামলার আসামি সবুজ মুজিব চেয়ারম্যানের পক্ষ হয়ে এনাম নামে অপর এক বাহিনীর সাথে যৌথ ভাবে জমিটি দখলে নিয়েছিলেন। কিন্তু জমিটি দখলের কয়েকদিন পর এনাম বেশ কিছু ইয়াবাসহ র‌্যাব-১৫ এর সদস্যের হাতে আটক হন। আরেক মামলায় ওয়ারেন্টি আসামি হিসেবে কারাগারে যান সবুজ। কিন্তু অল্প সময়ে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপরই জমিটির বর্তমান দখলদার ওবাইদুল হোসেনদের হঠাতে মোনাফ সিকাদারকে হত্যার পরিকল্পনা নেন।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, কারাগারের থাকা এনামের পিতা সম্প্রতি মারা যান। পিতার জানাজা পড়তে প্যারোলো মুক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসেন এনাম। ওনদিন পুলিশের সামনেই কয়েকজনকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে যান এনাম।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্টে ১ দশমিক ১০ একর জমি নিয়েই এখন পর্যটন জোনে অস্থিরতা চলছে। ১৯৯১ সালে গণপূর্ত বিভাগ থেকে এই জায়গার বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন চকরিয়ার পূর্ব বড় ভেওলা গ্রামের সায়েরা খাতুন। জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে ছিল। এই জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মেয়র মুজিব-মোনাফ ও সরকারের দ্বন্দ্ব। জমিটি এখন মোনাফ সিকদারের পক্ষের লোকদের হাতে।

কক্সবাজার সদর ভূমি কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, এই জমি হোটেল-মোটেল জোনের অধীনে উল্লেখ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নু-এনং মারমা মং বলেন, এই এলাকাকে যখন হোটেল-মোটেল জোন করা হয়, তখন সেটি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু একটি খতিয়ানের দাগ নম্বর এর বাইরে থেকে যায়। এতে উচ্ছেদ করা যাচ্ছিল না। পরবর্তী সময়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসনে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। পরে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে ২০২০ সালের শুরুতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু জায়গার মালিকদের একটি পক্ষ কাগজপত্র নিয়ে জেলা প্রশাসনে যায়। এরপর থেকে বিষয়টি ঝুলে আছে।

সূত্র মতে, বর্তমানে জায়গাটির দাবিদার একটি অংশের নিয়ন্ত্রণে আছেন ওবাইদুল। তিনি মোনাফ সিকদারের চাচা। তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া জমিতে সুগন্ধা শুঁটকি মার্কেট করা হয়েছে। দোকান আছে ৩৪টি। প্রতিটির মাসিক ভাড়া ১০ হাজার টাকা। এই মার্কেটের সামনে মোনাফকে গুলি করা হয়েছিল।

মোনাফের চাচাতো ভাই রানা সিকদার বলেন, মার্কেটের জায়গা দখল নিয়ে মেয়র মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মোনাফের বিরোধ শুরু হয়। ২০১৭ সালে চাচা ওবাইদুল জায়গাটির ৫৫ শতক সায়েরা খাতুনের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে নেন। এর আগে জায়গাটি দখল করে রেখেছিলেন এক ব্যক্তি। তবে ২০১৯ সালে ওই ব্যক্তিকে হটিয়ে তারা জায়গার নিয়ন্ত্রণ নেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি আবার জায়গাটির দখল নিতে মেয়রের শরণাপন্ন হন। একপর্যায়ে মেয়র দলবল নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারির দিকে জায়গাটি দখলে নেন। তখন তারা আদালতে যান। জুন মাসে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে এবং প্রভাব খাটিয়ে জায়গাটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করোনাকালে ব্যবসা-বাণিজ্য সব স্তব্ধ ছিলো কক্সবাজারে। প্রায় এক বছর পর সম্প্রতি আবারো স্বল্প পরিসরে খুলেছে পর্যটন। ক্ষতি পুষানোর যখন চেষ্টা চলছে ঠিক তখনই গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় পর্যটকরা আতঙ্কিত। সেই ঘটনায় মামলা জেরে সরকারি দলের নেতারা টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় অনেক পর্যটক রুম ছেড়ে কক্সবাজার ত্যাগ করেন। অনেকে বালিত করেছেন হোটেল বুকিংও। এসব ঘটনায় গত চার দিনে কম করে হলেও ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের।

আবারো স্বল্প পরিসরে খুলেছে পর্যটন। ক্ষতি পুষানোর যখন চেষ্টা চলছে ঠিক তখনই গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় পর্যটকরা আতঙ্কিত। সেই ঘটনায় মামলা জেরে সরকারি দলের নেতারা টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় অনেক পর্যটক রুম ছেড়ে কক্সবাজার ত্যাগ করেন। অনেকে বালিত করেছেন হোটেল বুকিংও। এসব ঘটনায় গত চার দিনে কম করে হলেও ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের।

জেলা আওয়ামী লীগের আরো একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিব নিজের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে বিরোধপূর্ণ হোটেল ও জমি দখলে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। কিন্তু বদনাম হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের। কেউ তার কর্মকা-ের বিরোধিতা করলে বা মামলা করলে পর্যটক ও জনগণকে জিম্মি করে মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টা আইনসম্মত নয়। আমরা চাই সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মেয়র মুজিবুর রহমানের মুঠোফোনে বার বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। যদিও এর আগে তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছিলেন।
কক্সবাজার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় জড়িতের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কাজ করছে পুলিশ। আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িতের আইনের আওয়াতায় আনা সম্ভব হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় কক্সবাজার শহরে কিছু সময় অস্থিরতা ছিলো। কিন্তু পর্যটন শহরের সবকিছুই এখন স্বাভাবিক গতিতে চলছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (২৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে নয়টার দিকে কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় মার্কেটের সামনে আড্ডারত মুনাফ সিকদারকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। মুনাফ সিকদারের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি এখন সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মুনাফ সিকদার (৩২) শহরের পেশকারপাড়া এলাকার শাহাব উদ্দিন সিকদারের ছেলে।

সূত্র -মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *