ঢাকা, মঙ্গলবার ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন
আরও বেশি ক্ষমতায় চোখ ডিসি-ইউএনওদের
ডেস্ক রিপোর্ট ::

মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) আরও ক্ষমতা চান। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নসহ একাধিক বিষয়ে বাড়তি ক্ষমতা চেয়ে প্রস্তাব এসেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। ৬৪ জেলার ডিসির পাঠানো প্রায় পৌনে তিনশ প্রস্তাব পর্যবেক্ষণ করে এমন চিত্রই মিলেছে। আগামীকাল শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন। এ উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসকরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নানা বিষয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

জানা গেছে, ‘জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব ও কার‌্যাবলি-২০১১’ অনুযায়ী, নির্দিষ্টভাবে ৬২টি বিষয় দেখভালের কথা উল্লেখ আছে। গত এক যুগে এসব দায়িত্বে পরিধি আরও বেড়েছে। সেই সঙ্গে লিখিতের বাইরেও সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয়ে জেলা পর্যায়ে ডিসি এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ আছে। এসবের পরও সংশ্লিষ্ট জেলার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাবও দিয়েছেন ডিসিরা। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আইন-নীতিমালা পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে তাদের কাছ থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাঠ প্রশাসনে ডিসি ও ইউএনও হাতে এমনিতেই অনেক ক্ষমতা আছে। এরপরও তারা আরও কিছু বিষয়ে নিজেদের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। যাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় তারা আরও বেশি ক্ষমতার অধিকারী হতে চাচ্ছেন।

এবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনের ভেন্যু রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন। প্রথম দিন ১৮ জানুয়ারি সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সম্মেলন উদ্বোধন করবেন। কর্মসূচি অনুযায়ী এবার ২১টি কার্য অধিবেশনসহ মোট ২৫টি অধিবেশন থাকবে। এর মধ্যে প্রথম দিন ৭, দ্বিতীয় দিন ৮ এবং তৃতীয় দিন থাকবে ১০টি অধিবেশন। এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গেও ভার্চুয়ালি সৌজন্য সাক্ষাতের সেশন হবে ডিসিদের।

আরও ক্ষমতা : পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে বৈধ লাইসেন্স দেওয়া হয়। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মতামত নেওয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন মৌলভীবাজারের ডিসি। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, এতে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই হওয়ার সঙ্গে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ইউএনওদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এর অধীনে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ২২৮ ধারা অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করেছেন নাটোরের ডিসি। দণ্ডবিধির উল্লিখিত ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের যে কোনো পর্যায়ে নিয়োজিত থাকাকালে কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অপমান করে বা তার কাজে বাধা প্রদান করে, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত যে কোনো পরিমাণ অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মচারীদের বদলির ক্ষমতা যথাক্রমে বিভাগীয় কমিশন ও ডিসি অফিসকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ঝালকাঠির ডিসি। তৃতীয় শ্রেণির (১১-১৬ গ্রেড) কর্মচারীদের সব পদে নিয়োগ ডিভিশনাল সিলেকশন বোর্ডের (ডিএসবি) অধীনে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ঢাকার ডিসি।

এসএমই ও ক্ষুদ্রঋণ সমন্বয়ে ডিসির নেতৃত্বে কমিটি করার প্রস্তাব এসেছে বরিশালের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে। মাদারীপুরের ডিসি প্রস্তাব দিয়েছেন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাছ থেকে প্রত্যয়ন পত্র নিতে হবে। এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপের কথাও বলেন তিনি। অন্যদিকে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেট ও মাগুরার ডিসি। জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে কুমিল্লার ডিসির কাছ থেকে।

জেলা পর্যায়ে অবৈধ পাইপলাইনে বা সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ডিসি। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে ডিসিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ফরিদপুরের ডিসি। নিজের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ও ধর্মঘটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে সহায়তা করতে চান ডিসিরা। পদাধিকারবলে জেলায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সদস্য থাকলে শিক্ষার পরিবেশসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের মাধ্যমে প্রতিনিধি মনোনয়নের দাবি করেছেন নেত্রকোনার ডিসি। রাঙামাটির ডিসি জেলা পর্যায়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা কমিটি চেয়েছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নিজ জেলার বাইরে অন্য জেলায় বদলির প্রস্তাব করেছেন মাদারীপুরের ডিসি। এসব কর্মকর্তা নিজ উপজেলা ও ইউনিয়নে কর্মরত থাকায় স্থানীয় রাজনীতিসহ সামাজিক অনেক বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। এতে করে তাদের দায়িত্ব পালন ব্যাহত হয়।

সরকার অনুমোদিত ‘ম্যানপাওয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি’গুলোর সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চান ডিসি ও ইউএনওরা। ঢাকার ডিসির এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এজেন্সিগুলোর সঙ্গে জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় থাকলে বিদেশগামী কর্মীরা দালালদের কবল থেকে মুক্ত থাকবে। সব জেলায় মালিক-শ্রমিক সমন্বয় কমিটির প্রধান হতে চান ডিসিরা।

বাণিজ্য সংগঠনগুলোর আয়োজনে মেলা হলে এ ক্ষেত্রে ডিসির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছেন বরিশাল ও ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি। অন্যদিকে রাজবাড়ী, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী এই ছয় জেলার ডিসি সব জেলা প্রশাসকের জন্য স্বেচ্ছাধীন তহবিলে যৌক্তিক বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

সুবিধা : পার্বত্য জেলার সব সরকারি কর্মচারীর মূল বেতনের ৩০ শতাংশের (শর্তহীন) বেশি ভাতা হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন খাগড়াছড়ির ডিসি। বর্তমানেও এ এলাকায় বাড়তি ভাতা হিসাবে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সিলিং দেওয়া আছে এর সর্বোচ্চ সীমা জেলা পর্যায়ে ৩ হাজার টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ৫ হাজার টাকার বেশি হবে না। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের ডিসি চাকরিরত অবস্থায় সরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাভাতা চালুর প্রস্তাব করেছেন। চুয়াডাঙ্গার ডিসি তৃতীয় শ্রেণির সব জেলাকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করেছেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জকে দ্বিতীয় শ্রেণির জেলা থেকে বিশেষ শ্রেণির জেলায় রূপান্তরের প্রস্তাব করেছে জেলাটির ডিসি। অন্যদিকে বিভাগীয় পর্যায়ে ইউএনওদের নিয়ে ‘উপজেলা নিবার্হী অফিসার সম্মেলন’ আয়োজনের কথা বলেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি।

আইন-নীতি সংক্রান্ত : ১৮৬৭ সালের বংগীয় জুয়া আইন অনুযায়ী ১০০ টাকা জরিমানা ও এক মাসের জেল দেওয়া যায়। এটি বর্তমানে জুয়া বন্ধে অকার্যকর উল্লেখ করে এক বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধানের প্রস্তাব দিয়েছেন ঝিনাইদহের ডিসি। শিক্ষার্থীদের বয়স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সংশোধনের প্রস্তাব করেছেন ঝালকাঠির ডিসি। তার দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে অন্তত ৬ বছর বয়স হতে হয়। এই হিসাবে একজন শিক্ষার্থী ১৬ বছরের নিচে এসএসসি পরীক্ষার দ্বারে যেতে পারেন না। অন্যদিকে শিক্ষা বোর্ডগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী ১৪ বছরের বেশি হলেই এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যায়। সাংঘর্ষিক এই নীতি সংশোধন করে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *