ঢাকা, সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:৪৭ অপরাহ্ন
ভুয়া সচিব পরিচয়েই কোটিপতি, সাক্ষাতে লাগতো লাখ টাকা
উখিয়া নিউজ ডেস্ক :

নোয়াখালীর সুবর্নচরের ভূমিহীন কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া নবম শ্রেণী পাশ কাদেরের জিপ গাড়ির ব্র্যান্ড ‘প্রাডো’। নিজেকে পরিচয় দিতেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘অতিরিক্ত সচিব’, গাড়িতে সাঁটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার। চারপাশে দেহরক্ষী, সবার হাতে ওয়াকিটকি। এছাড়াও নিজেকে পরিচয় দিতেন কথিত ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের প্রতিষ্ঠান ড্যাটকো এর লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে। সে প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন স্থাপনার কাস্টোডিয়ান হিসাবে টাকা পয়সা কোন ব্যাপার না বলে জাহির করে।

সচিব পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে তিন সহযোগীসহ আব্দুল কাদের নামের এই প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ এর গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের একাধিক টিম। পর তার সঙ্গে মুসা বিন শমসেরের যোগাযোগ ও লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় মুসা বিন শমসেরকে (প্রিন্স মুসা) জিজ্ঞাসাবাদ করবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

 

ডিবি সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলশানের ১ নম্বর সেকশনের জব্বার টাওয়ার। সেই ভবনে মাসিক পাঁচ লাখ টাকা ভাড়ায় আলিশান অফিস চালাতেন আব্দুল কাদের। কারওয়ান বাজারেও বিলাসবহুল অফিস আছে আরেকটি। গুলশানেই তার অভিজাত ফ্ল্যাট। কাজের ‘তদবির’ করার আগে শুধু তার সঙ্গে দেখা করতেই গুনতে হতো এক লাখ টাকা নজরানা। আভিজাত্যের রং মেখে কাদের নিজের পরিচয় দিতেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘অতিরিক্ত সচিব’ হিসেবে। এসব পরিচয়ের খোলসে এত দিন চালিয়ে গেছেন ভয়ংকর সব ছলচাতুরি, রকমারি ফন্দিফিকির।

গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর এবং গুলশান এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলো- আব্দুল কাদের চৌধুরী, শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া, শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান।

এ সময় তাদের কাছ থেকে থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলিসহ ১টি ওয়াকি-টকি, একটি নতুন প্রাডো জীপ গাড়ি, অতিরিক্ত সচিবের অফিশিয়াল আইডি কার্ড, অতিরিক্ত সচিবের ভিজিটিং কার্ড, তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসমূহ, ওয়ার্ক অর্ডারের কাগজপত্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার, লোন দেয়ার কাগজপত্র ও আবেদনপত্র , চেক বই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিজিটিং কার্ড, ভূইফোড় প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, টিন, বিভিন্ন চুক্তি/ বায়না দলিল, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ছবিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, আব্দুল কাদের চৌধুরীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন। রাজধানীর গুলশানের জব্বার টাওয়ারে তার একটি কার্যালয় রয়েছে। সেখানে বসেই তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করানোর জন্যই সহযোগীরা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত টাকা নিতেন।

ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ভুয়া অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দানকারী আব্দুল কাদের চৌধুরী ঢাকা ট্রেড কর্পোরেশন, জমিদার ট্রেডিং, সামীন এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী গ্রুপ, হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশন, সততা প্রোপার্টিজ, ডানা লজিস্টিকস, ডানা মটর্স ইত্যাদি নাম সর্বস্ব কয়েকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত করতো। প্রতারক আব্দুল কাদের হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশনের ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের’ মাধ্যমে বড় রকমের প্রতারণা শুরু করে । ২০০৪ -২০০৬ সালে দেশের শত শত মানুষের কাছ থেকে সরকারি অনুদানে বাড়ি এবং খামার তৈরি করার নামে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

ডিবি প্রধান বলেন, গ্রেপ্তার কাদের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০ কোটি বা তার বেশি টাকার লোন পাইয়ে দেয়ার নামে প্রতারণা করে থাকে। এক্ষেত্রে প্রথমেই তার নিয়োগকৃতরাসহ অন্যান্য মার্কেটিং এর লোক বিভিন্ন ঠিকাদার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট করতে থাকে। ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে সাক্ষাতে প্রার্থীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ভিজিট ফি নিতো। ব্যাংক থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লোন পাইয়ে দেয়ার নামে প্রসেসিং ফি বাবদ্য ৫-১০% টাকা ডাউনপেমেন্ট হিসেবে নিতো।

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, সে অন্যান্যদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মানোর জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এবং বিভিন্ন সরকারি প্রজেক্ট এর শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছেন বলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে। এ ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডারসমূহ বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাছে বিক্রি করে থাকে। তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা জামানত রেখে প্রতারণা করতো।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানায়, এছাড়া সে বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকে লোক নিয়োগ দেয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়। গ্রেপ্তাররা সততা প্রপার্টিজের নামে নামমাত্র কিছু টাকা বায়নার মাধ্যমে জমি এবং স্থাপনা কেনার জন্য চুক্তি করে, যেগুলো দিয়ে পরবর্তীতে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে টাকা আদায় করে থাকে। এই প্রতারণার কাজগুলো করার জন্য গ্রেপ্তার অশিক্ষিত কাদের নিজেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন শেষে সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হিসেবে পরিচয় দিতো।

ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রতারক আব্দুল কাদের নিজেকে কথিত ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের প্রতিষ্ঠান ড্যাটকো এর লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দিতো। সে প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন স্থাপনার কাস্টোডিয়ান হিসাবে টাকা পয়সা কোন ব্যাপার না বলে জাহির করে চাকরিপ্রার্থী, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রতারণা করতো।

গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আব্দুল কাদের তার দালাল ও মিডিয়া ম্যান-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রলুব্ধ করে বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান এবং ওয়ার্ক অর্ডার, সাব-কন্ট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রসেসিং করতো। তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য সে ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের পরিচয়, ভুয়া সিআইপি, দামি দামি গাড়ি, বডিগার্ড, ওয়্যারলেস সেট ইত্যাদি ব্যবহার করত।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত ভুয়া কার্যাদেশ,মুসার বিন শমসের সঙ্গে তার ছবি এবং বিভিন্ন লেনদেনের ভুয়া কাগজপত্র ব্যাবহার করতো। ৩৩ জন সচিবসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে তার কনসোর্টিয়াম, ব্যবসা আছে বলে প্রচার করতো বলেও জানায় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *